
Table of Contents
ক্রিপ্টো মাইনিং বোঝা
ক্রিপ্টো মাইনিং নিয়ে ভাবলে আপনার কল্পনায় কি আসে? ক্রিপ্টোকারেন্সির খোঁজে মাটির নিচে খননরত একটি দল? নাকি কয়েনের সন্ধানে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে মাটির উপরিস্তর খুঁড়ে ফেলার দৃশ্য? কিছু মূল্যবান খনিজের ক্ষেত্রে এই ছবিটি সঠিক হতে পারে, তবে ক্রিপ্টো মাইনিং কাজ করে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে। এটি আসলে কি, আর ক্রিপ্টোকারেন্সি মাইনিং নিয়ে এত আলোচনা কেন? চলুন বিস্তারিত দেখা যাক।
ক্রিপ্টো মাইনিং কি?
ক্রিপ্টো মাইনিং হলো বিদ্যমান কোনো ক্রিপ্টোকারেন্সির নতুন কয়েন তৈরির প্রক্রিয়া। তবে ফিয়াট মুদ্রা যেমন ইচ্ছেমতো ছাপানো যায়, ক্রিপ্টো মাইনিং তেমন নয় - এটি একেবারে আলাদা একটি পদ্ধতি অনুসরণ করে।
প্রতিটি ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন যাচাই করা হয় এবং ব্লকচেইন নামে পরিচিত একটি ডিজিটাল লেজারে নথিভুক্ত করা হয়। ব্লকের এই চেইন ক্রিপ্টোগ্রাফি ব্যবহার করে নিরাপদে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে: ব্লকচেইনের অখণ্ডতা ও কনসেনসাস কিভাবে যাচাই করা হয়? ঠিক এখানেই ক্রিপ্টো মাইনিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রতিটি লেনদেনের অখণ্ডতা যাচাই করে double spending এর মতো সমস্যা যাতে না ঘটে তা নিশ্চিত করার রিওয়ার্ড হিসেবে মাইনাররা নতুন তৈরি হওয়া কয়েন পান। এই প্রক্রিয়ায় জটিল গাণিতিক সমস্যা বা “proof” সমাধান করতে হয়, যেগুলো ইচ্ছাকৃতভাবেই সমাধান করা কঠিন কিন্তু যাচাই করা সহজ। কোনো মাইনার এমন একটি সমস্যা সফলভাবে সমাধান করলে তিনি ব্লকচেইনে লেনদেনের একটি ব্লক যোগ করার অনুমতি পান। এই পরিশ্রমের বিনিময়ে তাকে নতুন মিন্ট করা কয়েন রিওয়ার্ড হিসেবে দেওয়া হয়।
মাইনিং হার্ডওয়্যার ও মাইনিং পুল
ক্রিপ্টোকারেন্সির শুরুর দিকে সাধারণ পার্সোনাল কম্পিউটার দিয়েই মাইনিং করা হতো। তবে গাণিতিক সমস্যাগুলোর জটিলতা যত বেড়েছে, এই কম্পিউটারগুলো ততই কম শক্তিশালী হয়ে পড়েছে। এর ফলে মাইনাররা আরও শক্তিশালী গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট (GPU) এ চলে যান, এবং শেষ পর্যন্ত ASIC (Application-Specific Integrated Circuits) নামে পরিচিত বিশেষায়িত হার্ডওয়্যারে, যা কেবল মাইনিংয়ের জন্যই তৈরি। এই হার্ডওয়্যারগুলো প্রচলিত খনন কাজের কোদাল ও কুড়ালের মতোই - প্রক্রিয়াটি চালু রাখার জন্য অপরিহার্য।
মাইনিং পুল
মাইনিং অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক হওয়ায় একা কাজ করা কোনো মাইনারের নিজে থেকেই ব্লকচেইনে ব্লক যোগ করার মতো কম্পিউটেশনাল ক্ষমতা থাকা তুলনামূলকভাবে বিরল। ফলে মাইনাররা প্রায়ই একসঙ্গে কাজ করেন এবং নিজেদের কম্পিউটেশনাল রিসোর্স একত্র করেন - এগুলোই মাইনিং পুল নামে পরিচিত।
এই মাইনিং পুলগুলো মাইনারদের নেটওয়ার্ক জুড়ে যৌথভাবে নিজেদের প্রসেসিং ক্ষমতা ভাগ করে নিতে দেয়। বিনিময়ে রিওয়ার্ড বণ্টন করা হয় ব্লক খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনায় প্রতিটি মাইনার যতটুকু কাজ যোগ করেছেন, সেই অনুপাতে।
শীর্ষ BTC মাইনিং পুল। উৎস: mempool.space
অন্যান্য কনসেনসাস মেকানিজম
জেনে রাখা দরকার যে ক্রিপ্টো মাইনিং সব ক্রিপ্টোকারেন্সির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কেবল সেই ক্রিপ্টোকারেন্সিগুলোরই মাইনার থাকে, যেগুলো proof-of-work কনসেনসাসের অধীনে চলে। এর বড় উদাহরণগুলোর মধ্যে আছে বিটকয়েন, Monero ও Litecoin।
Proof-of-Stake (PoS)
proof-of-work কনসেনসাস যতই ভালো হোক, একটি বড় সমস্যা একে ভোগায় - পরিবেশের উপর খারাপ প্রভাব। PoW পুরোপুরি কার্যকর রাখতে যে বিপুল শক্তি খরচ হয়, তা থেকেই অন্যান্য কনসেনসাস মেকানিজমের বিকাশ ঘটেছে, যেগুলোর মধ্যে proof of stake (PoS) সবচেয়ে জনপ্রিয়।
PoS এর অধীনে ভ্যালিডেটরদের (PoS এ মাইনারদের সমতুল্য) নতুন ব্লক তৈরি ও লেনদেন যাচাই করার জন্য বেছে নেওয়া হয় তাদের কাছে থাকা এবং জামানত হিসেবে “stake” করতে ইচ্ছুক কয়েনের সংখ্যার ভিত্তিতে। PoS কে সাধারণত কম শক্তি-নিবিড় প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়, কারণ এটি হিসাব থেকে কম্পিউটেশনাল “work” এর উপাদানটি সরিয়ে দেয়।
Delegated Proof of Stake (DPoS)
DPoS হলো প্রচলিত PoS মডেলের একটি ধরন, যা EOS ও Tron এর মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে। DPoS এ টোকেনধারীরা সরাসরি লেনদেন যাচাই করেন না বা ব্লক তৈরি করেন না। বরং তারা নিজেদের পক্ষে এই কাজ করার জন্য ডেলিগেট নির্বাচন করেন, যাদের কখনো কখনো witness বা block producer বলা হয়। এই ডেলিগেটরা নেটওয়ার্কের অখণ্ডতা বজায় রাখার দায়িত্বে থাকেন এবং কাজ করতে ব্যর্থ হলে ভোটের মাধ্যমে তাদের সরিয়ে দেওয়া যায়।
Proof of Authority (PoA)
Proof of Authority এ লেনদেন ও ব্লক যাচাই করে অনুমোদিত অ্যাকাউন্টগুলো, যেগুলো ভ্যালিডেটর নামে পরিচিত। ভ্যালিডেটরদের সাধারণত তাদের সুনামের ভিত্তিতে বেছে নেওয়া হয় এবং তাদের কাছ থেকে নেটওয়ার্কের সর্বোত্তম স্বার্থে কাজ করার প্রত্যাশা থাকে। PoA, PoW এর চেয়ে দ্রুত ও বেশি শক্তি-সাশ্রয়ী। তবে যেহেতু ভ্যালিডেটররা পরিচিত সত্তা, তাই PoA নেটওয়ার্ক বেশি কেন্দ্রীভূত এবং সেন্সরশিপের ঝুঁকিতে বেশি থাকতে পারে।
ক্রিপ্টো মাইনিংয়ের ভবিষ্যৎ
অনেক নতুন কনসেনসাস মেকানিজম আসার পরও ক্রিপ্টোকারেন্সির জগতে ক্রিপ্টো মাইনিং এখনো সমাদৃত। এর একমাত্র ব্যতিক্রম হলো মাইনিং পদ্ধতির টেকসইতা নিয়ে চলমান আলোচনা - কিছু ক্রিপ্টোকারেন্সি সক্রিয়ভাবে আরও পরিবেশবান্ধব বিকল্প খুঁজছে বা পরিবেশের উপর নিজেদের প্রভাব কমাতে কনসেনসাস মেকানিজম বদলাচ্ছে।
আশা করা যায়, ক্রিপ্টো জগৎ যতই পরিণত হবে, মাইনিংও নিঃসন্দেহে তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে বিকশিত হতে থাকবে।


